উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দর, সামনে কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আর দক্ষিণে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দর, টানেল ও ভবিষ্যৎ সড়ক যোগাযোগের এ বলয়ের মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠবে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসাবে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে মোট ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন এই শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সুবিধা এর অবস্থান। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সড়কটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পাঞ্চলটি চট্টগ্রাম বন্দর ও ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সমন্বিত শিল্প ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারে।
তবে মানচিত্রে কাছাকাছি অবস্থান থাকলেই শিল্পায়ন নিশ্চিত হয় না। সংযোগ সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত বিনিয়োগ সেবা একই সময়ে নিশ্চিত হলেই অবস্থানগত সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
প্রায় এক দশক অপেক্ষার পর গত সোমবার শিল্পাঞ্চলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো। তবে প্রকল্পের নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য ২০৩১ সালের ডিসেম্বর।
এক দশকের অপেক্ষার অবসান
বাংলাদেশ ও চীন সরকার এই অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এ বিষয়ে সমঝোতা হয়। তবে ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন ও চুক্তির শর্ত নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
প্রথমে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে প্রকল্পটির ডেভেলপার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত এগোয়নি। পরে ২০২২ সালে চীন সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে। সে অনুযায়ী, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময় হয়। এর আগে ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) শিল্পাঞ্চলটির সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে। এর মধ্যে সরকার ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা জোগান দেবে, বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বিদেশি ঋণসহায়তা বাবদ নেওয়া হবে।
এই শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান। তবে শুরুতে এমন শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া দরকার, যেগুলোর জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হয় না। সময়মতো অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত করা গেলে এটি চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য শিল্প-করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে
আমিরুল হক, সভাপতি, চট্টগ্রাম চেম্বার
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আনোয়ারার এই শিল্পাঞ্চলে শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে। এর প্রভাব শুধু আনোয়ারায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে পড়বে।
যেসব অবকাঠামো হবে
জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় ২০ হাজার ডেডওয়েট টন সক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর একটি বহুমুখী জেটি নির্মাণ করা হবে। থাকবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, একটি সেতু এবং ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক।
শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার তরল বর্জ্য শোধনক্ষম কেন্দ্রীয় শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া গ্যাস সঞ্চালন লাইন, দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, পানি সংরক্ষণাগার, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
বেজা প্রথম তিন বছরের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৬০ শতাংশ প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করার লক্ষ্য নিয়েছে। সে অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের বড় একটি অংশে কারখানা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা।
শিল্প করিডরে নতুন কেন্দ্র
কর্ণফুলী টানেল চালুর পর মিরসরাই থেকে আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় নতুন শিল্প করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই করিডরে বন্দর, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও লজিস্টিক অবকাঠামোকে একই অর্থনৈতিক বলয়ে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে কর্ণফুলী টানেল চালু হয়েছে। আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের কাজ শুরু হচ্ছে। আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশ পর্যন্ত বিদ্যমান সড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। একই সঙ্গে আনোয়ারার কালাবিবির দিঘি থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়ার টইটং হয়ে কক্সবাজারের মাতামুহুরী পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্ত করা হবে। এতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে যাওয়ার পথ সহজ হবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ ২০৩১ সালে শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়িত হলে একই সময়ের মধ্যে বন্দর, সড়ক ও শিল্পাঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্পাঞ্চলটির আরেকটি সুবিধা হবে নিজস্ব বহুমুখী জেটি। এতে কিছু কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য নদীপথে আনা-নেওয়া যাবে। ফলে সব পণ্যের জন্য সড়কের ওপর নির্ভর করতে হবে না।
টানেলের ব্যবহারও বাড়তে পারে
কর্ণফুলী টানেল চালুর আগে ধারণা করা হয়েছিল, দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়ন ও মাতারবাড়ীমুখী যান চলাচল বাড়লে টানেলটি ব্যস্ত পণ্য পরিবহনের পথে পরিণত হবে। বাস্তবে এখনো প্রত্যাশিত যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না।
চীনা শিল্পাঞ্চলের কারখানা চালু হলে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহনে টানেলটির ব্যবহার বাড়তে পারে। যদিও তা তাৎক্ষণিক হবে না। শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ, কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন শুরু হতে আরও কয়েক বছর লাগবে।











Leave a Reply